পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষা ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন: এক সুদূরপ্রসারী অভিশাপ
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ক্ষেত্র দীর্ঘকাল ধরেই তার ঐতিহ্য, মেধা এবং জ্ঞানচর্চার পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই পবিত্র অঙ্গন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়েছে, যার ফলস্বরূপ শিক্ষার গুণগত মান থেকে শুরু করে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা এক গভীর সংকটের মুখে পতিত হয়েছে। এই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কুফল কেবল বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষাজীবনকেই কলুষিত করছে না, বরং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাজ্যের ভবিষ্যৎকেও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলছে।
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের মূল লক্ষণগুলি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনে সরাসরি হস্তক্ষেপ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা ও স্বজনপোষণ, পাঠ্যক্রমের রাজনৈতিকীকরণ এবং শিক্ষকদের দলীয় আনুগত্যে বাধ্য করা। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপাচার্য নিয়োগ পর্যন্ত সর্বত্রই রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট। যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্য এবং আর্থিক লেনদেন নিয়োগের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াচ্ছে, ফলে মেধাবী এবং যোগ্য শিক্ষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানের উপর। অপরিণত এবং অযোগ্য শিক্ষকের দ্বারা পঠন-পাঠন দুর্বল হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
পাঠ্যক্রমের রাজনৈতিকীকরণ আরেকটি উদ্বেগের কারণ। ইতিহাস থেকে শুরু করে সমাজবিজ্ঞান পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে দলীয় মতাদর্শ ঢোকানোর চেষ্টা চলছে। শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার বিকাশের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মননশীলতা এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। তারা প্রশ্ন করতে ভয় পাচ্ছে এবং অন্ধভাবে দলীয় মতবাদ মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
শিক্ষকদের উপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, সরকারের সমালোচনা করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে স্বাধীন নন। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের নিজেদের অধিকারের জন্যেও রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে, যা তাঁদের মর্যাদা ও আত্মসম্মানকে ক্ষুণ্ণ করছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা জ্ঞান বিতরণের পরিবর্তে দলীয় কর্মীদের মতো আচরণ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হল ছাত্র রাজনীতির নামে সন্ত্রাস ও হানাহানি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের দাদাগিরি, মারামারি, এবং তোলাবাজি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে, সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। মেধাবী ছাত্ররা ভয়ে ক্যাম্পাসে আসতে দ্বিধা বোধ করছে, যার ফলে শিক্ষার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
এই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ফল সুদূরপ্রসারী। প্রথমত, শিক্ষার গুণগত মান ক্রমশ নিম্নগামী হচ্ছে, যা রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে পিছিয়ে দিচ্ছে। জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে প্রবেশে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, যা রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা ও ভীতির পরিবেশ তৈরি হওয়ার ফলে মেধাবী শিক্ষক ও গবেষকরা এই রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে বা বিদেশে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি মেধাশূন্যতা তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ।
তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন এবং বিদ্বেষের বীজ বপন করা হচ্ছে। ছাত্রজীবনে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে যে বিভাজন তৈরি হয়, তা পরবর্তীকালে সমাজে আরও বৃহত্তর সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে এটি একটি বড় বাধা।
চতুর্থত, শিক্ষা ব্যবস্থার উপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমছে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। অনেকেই আর্থিক সামর্থ্য থাকলে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে বাধ্য হচ্ছেন অথবা রাজ্যের বাইরে পড়াশোনার জন্য পাঠাচ্ছেন। এর ফলে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে অবিলম্বে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের হাত থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রকে রক্ষা করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা আনা জরুরি। মেধাকে একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পাঠ্যক্রমকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে এবং শিক্ষকদের স্বাধীনভাবে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। ছাত্র রাজনীতির নামে সন্ত্রাস ও হানাহানি কঠোর হাতে দমন করতে হবে এবং ক্যাম্পাসে একটি সুস্থ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ক্ষেত্রের ঐতিহ্য ও গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য সরকার, শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক, প্রগতিশীল সমাজ গঠনের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে। অন্যথায়, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের এই সুদূরপ্রসারী অভিশাপ রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে।